সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল : মলয় রায়চৌধুরীর রাজনৈতিক কবিতা মলয় দা, মলয় রায়চৌধুরী এক অদ্ভূত মানুষ। ৮২ বয়সেও ২৮ বছরের তরুণ কবিদের মতো তারুণ্য লালন করেন। আমি তাঁর এক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তার জবাবে আরো তা টের পেয়েছি। তাঁর সাথে আমার দেখা হয়। বাংলাদেশে কবিদের দৌঁড় কলিকাতা পর্যন্ত। আমার মতো সাধারণ কবির পক্ষে কি স্বর্গীয় দিল্লি যাওয়া তো কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমার কবিতায় মলয় দা ঢুকে গেছেন, আবার মলয় দা আমাকে নিয়েও কবিতা লিখেছেন, ফেইসবুক লাইভে আমার কবিতা পাঠ করেছেন। কি সব অদ্ভূত কাণ্ডই না করেন মলয় দা। গুণ দা'র মতো তাঁর পাগলামির শেষ নাই। শাশুড়িকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেন। প্রেমিকাকে বলনে- ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো’। আমি বলেছিলাম, মাথা নাকি নুনু? তিনি যে জবাব দিয়েছিলেন, তাতেও টাশকি খেয়েছি। ‘১৯৬০-এর দশকের হাংরি আন্দোলন হাংরিয়ালিজম— তথা বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক ১৯৬০-এর দশক থেকেই ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। গতানুগতিক চিন্তাধারা সচেতনভাবে বর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে উত্তর আধুনিকতাবাদ চর্চা এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার জন্যে রাষ্ট্রবিরোধী মামলায় গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। সম্প্রতি তাঁর একটি কবিতা পড়ে থ মেরে যাই। সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা এবং দেশ বিভাগ নিয়ে অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। কিন্তু মলয় রায়চৌধুরীর এই কবিতার অসাধারণ মর্মান্তিক এবং ভায়াবহ চিত্রকল্প চমকে দেয়! ফাঁসিতে ঝুলন্ত লাশ ঝুলতে ঝুলতে এক বার পাকিস্তান আবার হিন্দুস্থানের দিকে ঝুলছে!! কবিতার শিরোনাম “কে একজন ঝুলছে !” --------------------------------------- মেজদা বলল, “চল চল দেখে আসি, টিনের কারখানায় ঝুলে-ঝুলে পাক খাচ্ছে কেউ”। দৌড়োলুম, ম্যাজিক দেখবো ভেবে--- ক্যানেস্তারা কেটে টিনগুলো কাঠের হাতুড়ি পিটে সোজা করে। অতো উঁচুতে কেমন করে চড়েছিল ধুতি-শার্ট পরা রোগাটে লোকটা? চশমা রয়েছে চোখে! ভালো করে দেখে বললুম, “মেজদা ইনি তো আমাদের ক্লাসের অরবিন্দর বাবা ; ওরা দেশভাগে পালিয়ে এসেছিল ফরিদপুর থেকে, সেখানে ইশকুলে পড়াতেন, কিন্তু সার্টিফিকেট-টিকেট ফেলে জ্বলন্ত ঘর-দালান ছেড়ে চলে এসেছেন বলে কোথাও পাননি কাজ, শেষে এই টিনের শব্দ প্রতিদিন বলেছে ওনাকে, কী লজ্জা, কী লজ্জা, ছিছি…” কিন্তু অতোটা ওপরে উঠলেন কেমন করে! টিনবাঁধার দড়ি খুলে গলায় ফাঁস বেঁধে ঝুলছেন এখন, পাকও খাচ্ছেন, একবার বাঁদিকে হি...ন..দু...স...তা...ন...আরেকবার ডানদিকে...পা...কি...স...তা...ন হি…...ন…..দু…..স…..তা…..ন…..পা…..কি…..স…..তা…..ন ……………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………… সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল Saifullah Mahmud Dulal কবি, সাংবাদিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক। অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক আলহাজ্ব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও সারা শহীদুল্লাহ (বি.এ.) সংসারে ৩০ মে ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের জন্মভিটা শেরপুর জেলায়। তার স্ত্রী অপি মাহমুদ; দুই কন্যা অনাদি নিমগ্ন ও অর্জিতা মাধুর্যকে নিয়ে সপরিবারে কানাডায় বসবাস করছেন। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ছাত্রাবস্থায় দৈনিক ইত্তেফাকের মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতার জীবন শুরু। পরে দেশের বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৮০ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান। ১৯৯৬-এ তদানন্তিন সরকার তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দিলে প্রবাসী জীবন বেছে নেন। প্রবাসী বাঙালিদের জন্য নিউজ এজেন্সি ‘স্বরব্যঞ্জন’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রবাস থেকে প্রকাশিত (যুক্তরাষ্ট্র থেকে অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক প্রবাসী, সাপ্তাহিক আমার পক্ষে, মাসিক পরিচয়, সাহিত্য পত্রিকা আকার-ইকার, মাসিক অভিমত; কানাডার থেকে সাপ্তাহিক প্রবাস বাংলা, সাপ্তাহিক ঢাকা পোস্ট, পাক্ষিক দেশ দিগন্ত, মাসিক বাংলাদেশ, সাহিত্য পত্রিকা বাংলা জর্নাল; জাপানের মাসিক মানচিত্র, মাসিক আড্ডা টোকিও, বিবেক বার্তা; অস্ট্রেলিয়ার সাপ্তাহিক স্বদেশ বার্তা প্রভৃতি) পত্রিকার সাথে যুক্ত। টরেন্টো থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বাংলা রিপোর্টারে প্রধান সম্পাদক ছিলেন। তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের কানাডার বিশেষ প্রতিনিধি। টরন্টো থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা মেইল এবং সিবিএবন২৪'এর উপদেষ্ঠা সম্পাদক। এছাড়াও কানাডার একটি প্রডাকশন হাউজে কর্মরত! তার দু'টি প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে। যথাক্রমে- স্বরব্যঞ্জন এবং পাঠশালা। তিনি অনুস্বর, ছোটকাগজ, প্রচ্ছদ, সূচিপত্র এবং উপদেষ্টা সম্পাদক: বৈঠা। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন, একুশে টিভি, চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত। বিটিভির শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’র উপস্থাপক। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত নাটকসমূহ সাযযাদ আমিনের কথা (প্রচারঃ ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯); জাকির, সাদিকের জীবন ও সাহিত্য (১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯); বৃক্ষ বন্দনা (১২ ডিসেম্বর ১৯৯৯); মুহম্মদ আলির চিঠি ( ১২ এপ্রিল ২০০০); ভালোবাসি ভালোবাসি (ফেব্রিয়ারি ২০০১); ওডারল্যান্ড (২ জুন ২০০১); বনসাই (ফেব্রুয়ারি ২০০৭); বৈশাখী (এপ্রিল ২০০৯); জাদুকর (১৭ আগষ্ট ২০১৩); শাখা ও শেকড়। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদান রাখার জন্য তিনি দেশ-বিদেশ থেকে বেশ কিছু পুরষ্কার পেয়েছেন। তিনি সূচিপত্র সাহিত্যপত্রের জন্য তিনবার মুক্তধারা একুশে পুরস্কার ১৯৮৭, ১৯৮৮ এবং ১৯৯২; শিল্প সাহিত্যে শেখ মুজিব গ্রন্থের জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র পুরস্কার ১৯৯৭, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পদক ১৯৯৬; জাপান থেকে বিবেক সাহিত্য পুরষ্কার ২০০৫, পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাব্যশ্রী খেতাব ১৯৭৭ এবং মাইকেল মধুসূদন পদক ২০০৫ সালে। শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্মৃতি পদক ২০১৩ সালে এবং আবু হাসান শাহীন স্মৃতি শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০১৮। আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার ২০১৮, পূর্ব মেদনীপুর, পশ্চিম বঙ্গ। সাহিত্য দিগন্ত সন্মাণনা ২০১৯, ঢাকা। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এর প্রকাশিত বইয়ে সংখ্যা প্রায় ৬০টি। বই কবিতা : তৃষ্ণার্ত জলপরী, ফেব্রুয়ারি ১৯৮২, রুণা প্রকাশনী। তবু কেউ কারো নই (নাসিমা সুলতানের সাথে যৌথ), এপ্রিল ১৯৮৫, ছোটকাগজ। অপেক্ষায় আছি প্রতীক্ষায় থেকো, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ এবং ১৯৮৯, অনিন্দ্য। শহরের শেষ বাড়ি, জানুয়ারি ১৯৯১, ব্রাদার্স লাইব্রেরি। ঘাতকেরহাতে সংবিধান, ফেব্রুয়ারি ১৯৯০, মুক্তধারা। একি কাণ্ড পাতা নেই, ১৯৯৫, বিশাখা প্রকাশনী। দ্রবীভূত গদ্যপদ্য, ১৯৯৯ এবং ২০০১, স্বরব্যঞ্জন। ঐক্যের বিপক্ষে একা, ফেবুয়ারি ২০০০, ম্যাগনাম ওপাস। মুক্তিযুদ্ধের পঙক্তিমালা, ২০০১, কলম্বিয়া প্রকাশনী। এলোমেলো মেঘেরমন, ফেব্রুয়ারি ২০০০, অনন্যা প্রকাশনী। নির্জনে কেনো এতো কোলাহল, ২০০০, অনন্যা প্রকাশনী। পরের জায়গা পরের জমি, ২০০৪, উৎস প্রকাশন। নিদ্রার ভেতর জেগে থাকা, ২০০৪, সাংস্কৃতিক খবর, কলকাতা। ঘৃণিত গৌরব, ২০০৫, জাগৃতি প্রকাশন। কবিতাসমগ্র,ফেব্রুয়ারি ২০০৬, অনন্যা প্রকাশন। নীড়ে নিরুদ্দেশে, ২০০৮, স্বরব্যঞ্জন। সাতে নেই, পাঁচে আছি, ফেব্রুয়ারি ২০১২। প্রেম বিরহের কবিতা, (শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সাথে এক বক্সে), ১৯৯৬ শিখা প্রকাশনী। রবি ঠাকুরের প্রাইভেসি, ২০১৫, নওরোজকিতাবিস্তান। পাখিদের গ্রামে আজ একটি গাছে সাথে সাক্ষাৎ করার কথা, জানুয়ারি ২০১৭, কবিতাপাক্ষিক, কলকাতা। ফেরোমনের গন্দে নেশাগ্রস্থ প্রজাপতি, জানিয়ারি ২০১৭, আবিষ্কার প্রকাশনী, কলকাতা। তোমার বাড়ি কত দূর, অন্যপ্রকাশ, ২০১৭। প্রেমের আগে বিরহে পড়েছি, পাঞ্জেরি, ২০১৮। সঙ্গমের ভঙ্গিগুলো, বেহুলা বাংলা, ২০১৯। তিন মিনিটের কবিতা, ২০২০, স্বরব্যঞ্জন। আমার সঙ্গে শেখ মুজিবের দেখা হবে আজ, ২০২০ অন্যপ্রকাশ। অন্যান্য বই : সাহিত্যের শুভ্র কাফনে শেখ মুজিব, ১৯৯৩ অনিন্দ প্রকাশ। শিল্প সাহিত্যে শেখ মুজিব, ১৯৯৬ এবং ১৯৯৬, শিখা প্রকাশনী। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ : মুজিব হত্যা মামলা, শিখা প্রকাশনী ২০০০, শিখা প্রকাশনী এবং আহমদ পাবলিশিং হাউস ২০২০। বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন, ২০০২, পাঠশালা। কানাডায় যাবেন কেনো যাবেন, ফেব্রুয়ারি,২০১২, প্রকাশনী। কানাডার কাশিমপুরে খুনি নূর চৌধুরী, ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, চন্দ্রদ্বীপ প্রকাশনী এবং ২০১৮ অনিন্দ্য প্রকাশন। কানাডার হাডির খরব নাড়ীর খবর, ফেব্রিয়ারি ২০১৭, সময় প্রকাশন। হারিয়ে যেতে নেই মানা (ভ্রমণকাহিনি) অনন্যা প্রকাশনী, ২০১৭। নাটকের বই : আজ আমাদের ছুটি, মার্চ ১৯৯৭, ২০১৭ শিশু একাডেমী। ওডারল্যান্ড, ২০০২, কলম্বিয়া প্রকাশনী। জাদুকরের উদ্দেশ্যে যাত্রা, ফেব্রুয়ারি ২০০১, আদিত্য অনিক প্রকাশনী। গল্পের বই : তুমি, ১৯৮৭, বিউটি বুক হাউজ। যাদুকর, ২০১৬, কথা প্রকাশ। কয়ড়া গ্রামে বুনো হাতি, ফেব্রিয়ারি ২০১৭, পাঠশালা। ভূতের পাসওয়ার্ড, ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বাংলাপ্রকাশ। রেসকোর্সের অশ্বারোহী ২০২০, অনন্যা। উপন্যাস : বীর বিচ্ছু, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, বংলাপ্রকাশ। যুদ্ধশিশুর জীবনযুদ্ধ, ২০১৭, বাংলাপ্রকাশ। গাছখুন, ২০১৯, পাঞ্জেরি পাবলিকেশন। স্মৃতিকথা : কাছের মানুষ দূরের মানুষ, ২০১৬, বাংলাপ্রকাশ। দূরের মানুষ কাছের মানুষ, ২০১৯, চৈতণ্য। ছড়ার বই : একাত্তরের দত্যি, ১৯৮৯, মুক্তধারা। কবি ঠাকুর রবি ঠাকুর, পাঠশালা ২০০৫। টাকডুমা ডুম ডুম, ২০০৫। পড়ার বই ছড়ার বই, ২০১০, ভাষাচিত্র। এক যে ছিলো শেখ মুজিব, ২০২০ পাঠাশালা। সম্পাদনা বই : মুক্তিযুদ্ধ : নির্বাচিত কবিতা, ১৯৮৭ নওরোজ কিতাবিস্থান। মুক্তিযুদ্ধ : নির্বাচিত ছড়া, ১৯৯০ পল্লব পাবলিশার্স। Poems of Liberation World ॥ Tren by Kabir Choowdhury, ২০০২, অন্যপ্রকাশ। বিভিন্ন ভাষায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা, স্বরব্যঞ্জন ২০০৫। মুক্তিযুদ্ধ :নির্বাচিত কবিতা (বাংলাদেশ, ভারত এবং ভিবিন্ন ভাষায়), জাগৃতি ২০০৫। কথাশিল্পীদের কবিতা, স্বরব্যঞ্জন ২০০৫। বঙ্গবন্ধুঃ ১০০ কবির ১০০ কবিরা, স্বরব্যঞ্জন ২০১৯। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত ১০০ ছড়া, পাঠশালা ২০২০। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত নির্বাচিত গল্প, স্বরব্যঞ্জন ২০২০। অন্যান্য বই : কবিতা সমগ্র ১ অনন্যা ২০০৯। বঙ্গবন্ধু সমগ্রঃ, স্বরব্যঞ্জন, ২০২০। শিশু কিশোর সমগ্র, ২০২০।
বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর পৌরুষ
-----------------------------------------
মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে হঠাৎ লিখছি কেন? এইজন্যে নয় যে আমার বই বেরোচ্ছে, আর বইএর ব্লার্বে তিনি যাচ্ছেতাই রকমের ভালো লিখে দিয়েছেন। সে তিনি অমনিও লিখতেন। (কাজ আদায় হয়েই গিয়েছে ) আমায় স্নেহ করেন, ভালোবাসেন একটু। আমি তাঁর বেশ-বয়সের অবন্তিকাদের মধ্যে একজন। ডিট্যাচড, পড়ুয়া, চোখে চশমা আঁটা, উচ্চাশী অবন্তিকা। তিনি আমার পিতৃপ্রতিম। জাগতিকে তাঁকে তেমনই ভালোবাসি। আর অন্য এক জায়গায় তাঁকে ভালোবাসি, যেমন ক’রে তাঁর অসাধারণ উপন্যাস “ডিটেকটিভ নোংরা পরীর কঙ্কাল প্রেমিকে”, অনেক আগে মরে যাওয়া কঙ্কালকে, এক বৃদ্ধের কংকালকে, তার জীবনের কনসেপ্টকে ভালোবেসে ফেলেছিল ইন্সপেক্টর রিমা খান। কেন? সেই গণিতবিদ, উৎশৃংক্ষল কংকালের পৌরুষের জন্য। আমি এই অদ্ভুত আখ্যানটি লিখছি কারণ, কবে এই কিংবদন্তীস্বরূপ বৃদ্ধ ফট ক’রে মরে যাবেন। এখনো দেখা করিনি। ফোন করিনি। যদি মরে যান, একা ফ্ল্যাটে ছটফট করবো শোকে। সেই ভয়ে, এখন কিছু দিয়ে রাখা। টিকে যেতেও পারেন অনেকদিন আরো। ভীষণ জীবনীশক্তি। জীবনকে ভালোবেসে চুষে খাবার ইচ্ছে।
মলয় রচৌকে দাদা বলার দূরভিলাষ হয় নি কখনো আমার। এই গ্যালিভার কেন যে লিলিপুটের সংসারে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টায় সারা শরীরে তাদের মই বেয়ে উঠতে দেন, সেই নিয়ে আমার এক চাপা ক্ষোভ ছিল। ইনি ভীষন পণ্ডিত। বাকি বড় বড় কবিদের মতো দূর থেকে কিছু কিছু জ্ঞানের কথা লিখলেই লোকে আশেপাশে ঘুরতো বেশী বলে আমার বিশ্বাস। তাও আমাদের মতো নতুন শিঙওলাদের, এবং আমাদের চাইতেও আরো আরো খাজা জনগণকে উনি প্রশ্রয় দেন। এই মার্কেটিঙের স্টাইলটা আমার পছন্দ নয়। কিন্তু পুরুষালী কড়া মদের মতো তীব্র আত্মবিশ্বাসে উনি যে এটা ক’রে যান, প্রচণ্ড টেক-স্যাভি, সরাসরি, আড়ালহীন প্রচার, এটাও আমার আজকাল ভালই লাগে।
তাঁর হাত দিয়ে যে কবিতা বেরিয়েছিল, (“প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ১৯৬৩ সালে ভারতীয় কবি মলয় রায়চৌধুরী রচিত ৯০ লাইনের একটি জলবিভাজক কবিতা। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে।প্রকাশের পর সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগে কবিতাটি নিষিদ্ধ করা হয়। ভারতীয় আদালতে হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তিনটি ধারায় মামলা হয় এবং মলয় রায়চৌধুরীসহ অন্যান্য আন্দোলনকারী গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে মামলাটি নাকচ হয়ে যায়। মামলা চলাকালীন সময়ে আমেরিকা ও ইউরোপে মলয় রায়চৌধুরীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, এবং বিভিন্ন ভাষায় কবিতাটি অনুদিত হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত 'মর্ডান অ্যান্ড পোস্টমর্ডান পোয়েট্রি অফ দ্য মিলেনিয়াম" সংকলনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে একমাত্র কবিতা হিসেবে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।” (উইকিপিডিয়া থেকে)), সেই কবিতা কারোর হাত থেকে বেরোনো শক্ত। সারা পৃথিবীর কবিতাপ্রেমী তা জানে। আমি আর তা নিয়ে বলি কেন। ওরকম একটা কোনদিন নামাতে পারলে বুঝতাম, হুঁ, কিছু করা গেলো। হবে না। সে আধার নেই আমার। তাই বলে ওনার এখনকার অনেক কেমন-যেন কবিতাকে লাইক টাইক দিতে পারি না। প্রয়োজনও নেই। যার এত উপন্যাস আছে, তাকে কেবা কবিতায় যাচে?
মলয় রচৌএর উপন্যাসগুলি ভীষণ ভীষণ আণ্ডাররেটেড। বাংলা সাহিত্যে ঠিক ওরকম উপন্যাস বেশি লেখা হয় নি। ভালোয় মন্দে শুধু না, অদ্ভুত অন্য ধারার জন্য। কেন লেখা হয় নি তার বড় কারণ আমার মতে এই যে, ওরকম টেস্টোস্টেরন সম্বলিত প্রেমিক পুরুষ খুব বেশী নেই মনে হয় বাংলা সাহিত্যজগতে।
এই জগতের ক্যাচাল আমি তেমন জানি না। কিন্তু মলয় রচৌ, মাঝে মাঝেই কাজের মেয়ে না এলে স্ত্রীএর সঙ্গে মন দিয়ে রান্নাবান্না বাসনমাজা, কাপড় কাচা ইত্যাদি করে ফেলেন। করার তো কথাই। জানি না তিনি জীবনে কতটা বিশ্বাসী অবিশ্বাসী ছিলেন সামাজিক অর্থে। খালি জানি, ইনবক্সে যখন কোন প্রশ্নের উত্তরে বলেন “বলে ফ্যাল । আজকে কাজের বউ আসেনি । বুড়ো-বুড়িকে অনেক কাজ করতে হবে । লাঞ্চে খিচুড়ি । ডিনারে প্যাটিস।”, কি ভালো যে লাগে! এই বুড়ি, যাঁকে আমি খালি ছবিতে দেখেছি, একসময়ের দাপুটে হকি খেলোয়াড়, তাঁকে এই “অ-কংকাল প্রেমিক” ভীষণ দাপটে ভালোবেসে গেছেন, এমন একটা ছবি বেশ মনে মনে আঁকতে পারি, এঁকে ভালো লাগে।
মলয় রচৌএর উপন্যাসের পুরুষদের মতো প্রেমিক আমি বাংলা উপন্যাসে কম দেখেছি। তাঁর “ডিটেকটিভ নোংরা পরির কংকাল প্রেমিক” উপন্যাসে, এক গণিতবিদ, বহুগামী অবিবাহিত পুরুষ, হঠাৎ এক স্বল্পপরিচিত সহকর্মী মহিলার “চলুন পালাই” ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গিয়েছিলেন বিন্ধ্যপর্বতের অন্য দিকে, তামিল দেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। নাগরিক সভ্যতার থেকে পালাতে চেয়েছিলেন এই উচ্চশিক্ষিতা তরুণী মায়া, আর মায়ার ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকে গেছিলেন সেই গণিতবিদ। এই উপন্যাসটি ছোট্ট, গোগ্রাসে গেলার মতো, নানান ভাবে রগরগে, আর নানান ভাবে ভীষণ ভীষণ সেরিব্রাল, মস্তিষ্কপ্রবণ। এই উপন্যাসে, জঙ্গুলে জীবনে ফিরতে চাওয়া মায়ার ঋতুস্রাবকালে, তাকে নিজ হাতে ধুইয়ে দিয়েছে তার প্রেমিক। অথচ দুজনে দুজনকে ডেকেছে “আপনির” দূরত্বের পবিত্রতায়, নিজেদের স্বত্ত্বাকে আলাদা বোঝাতে, “পবিত্রতার মতো অস্পষ্ট” শব্দকে ধূলিসাৎ করেও। এই উপন্যাসটির একটি রিভিউ আমি আগেও করেছি। বিশদে যাবো না। শুধু, এই প্রেমিকের প্রতি আমার গভীর মায়া যে বলে “চাল-পোড়া তো খাওয়া যাবে না , তাই মায়া চাল দাতাকে অনুরোধ করেছিল যে আমাদের একমুঠো ভাত দিলেই চলবে, কাঁচকলা পোড়া বা কাঁঠালবিচি পোড়া দিয়ে খেয়ে নেয়া যাবে, লঙ্কার টাকনা দিয়ে । প্রায় প্রতিদিনই ভাত পেতে লাগলুম , যদিও কলকাতায় যা খেতুম তার চেয়ে অনেক কমই, কিন্তু কম খেয়ে আর রাতে না খেয়ে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছিল কম খাবার । আমি চাইতুম মায়া বেশি খাক, মায়া চাইত আমি বেশি খাই । আমি একদিন বলেই ফেললুম, প্রকৃত ভালোবাসা কাকে বলে জানি না, কেবল যৌনতাই জেনে এসেছি এতকাল, আপনি ভালোবাসতে শেখালেন। জবাবে মায়া বলেছিল, অতীতকে আনবেন না প্লিজ, আপনি কী ছিলেন, কী করেছিলেন, সব ভুলে যান, সমস্তকিছু মুছে ফেলুন, আমি কি কোনো স্মৃতিচারণ করেছি?”। বা যে বলে “জীবনের বাঁকবদলগুলো, যতবার ঘটেছে বাঁকবদল, সব সব সব সব নারীকেন্দ্রিক ; নারীর ইচ্ছার, নির্দেশের, দেহের, আকর্ষণের, রহস্যের মোহে । স্কুলের শেষ পরীক্ষায় ভাল, সান্মানিক স্নাতকে খুব-ভাল , স্নাতকোত্তরে অত্যন্ত ভাল, তাদেরই কারণে , প্রভাবে, চাপে, আদরে । চাকরিতে যোগ নারীর জন্যে উন্নতি নারীর জন্যে, চাকরি ছাড়া নারীর জন্যে , ভাসমান জীবিকা নারীর জন্যে , অবসরে পৈতৃক বৈভবে পরগাছাবৃত্তি নারীর কারণে । কে জানে, হয়তো মৃত্যুও নারীর হাতেই হবে । জীবনে নারীদের আসা-যাওয়া, সেনসেক্স ওঠা-পড়ার মতন, না ঘটলে, আমার ব্যর্থতা, ব্যথা, পরাজয়, গ্লানি, অপরাধবোধ, এ-সবের জন্যে কাকেই বা দায়ি করতুম ! কাকেই বা দোষ দিতুম আমার অধঃপতনের জন্যে ? লোভি লম্পট মাগিবাজ প্রেমিক ফেরারি হয়ে ওঠার জন্যে ? হবার, নাকি হয়ে ওঠার ? আসলে আমি একটা কুকুর । আগের সিডিতে লিখেছি, তবু রিপিট করছি শেষনির খাতিরে । যে-মালকিনির হাতে পড়েছি , সে য-রকম চেয়েছে, যে-রকম গড়েছে , তা-ই হয়েছি । সেবার কুকুর, কাজের কুকুর, প্রজননের কুকুর, গুপ্তচর কুকুর, ধাঙড় কুকুর, কুরিয়ার কুকুর, প্রেডাটার কুকুর, পাহারাদার কুকুর, মানসিক থেরাপি কুকুর, শোনার কুকুর, শোঁকার কুকুর, চাটার কুকুর, রক্ষক কুকুর, গাড়িটানার কুকুর, কোলের কুকুর, আদরের কুকুর, এই কুকুর, ওই কুকুর, সেই কুকুর ইত্যাদি । কিন্তু একমাত্র কুকুর যেটাকে আমি ভালবেসেছি, তা হল মালকিনিকে উন্মাদের মতন ভালবাসার কুকুর । কিন্তু আমার লেজটা জন্মের সময়ে যেমন আকাশমুখো ছিল , চিরকাল তেমনই থেকে গেছে।”।
আমি নিশ্চিত যে, মলয় রচৌও এরকমই আকাশমুখো লেজের কুকুর। তিনি প্রবলভাবে, ভিতর থেকে, লিঙ্গসাম্যে বিশ্বাসী। “অরূপ, তোমার এঁটো কাঁটা” উপন্যাসে তিনি যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মহিলা চরিত্র বানিয়েছেন, যে লোভে লালসায়, ভালোবাসায়, প্রতিশোধে, ভীষণ রকম জীবন্ত ও অসহায়, মেয়েদের সবটুকু নিয়ে সবটুকু দিয়ে ভালো না বাসতে পারলে, রূপের মধ্যে ওরকম অরূপ, আর তার এঁটো কাঁটাসহ মচ্ছগন্ধ ধরে রাখা যায় না। এখানেই মলয় রচৌএর পৌরুষ। যে রকম পৌরুষ “দেহি পদপল্লবম উদারম” এর মতো উদাত্ত হাঁক দিতে পারতো জয়দেবের কালে, পারে একালেও। তাঁর “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” আর “ছোটোলোকের যুববেলা” তেমনই অকপট, দাপুটে, উজ্জীবিত, ভিগরস। নিজেকে বিশ্রেণীকরণ করেছেন শুধু জোর করে নয়। তিনি সেরকম হয়েও উঠেছেন। তাঁর মেজদার জন্মরহস্য পড়ে এক একবার মনে হয়েছে, সবটা বলে দেওয়া কি তাঁর ঠিক কাজ হয়েছে পরিবারের প্রতি? আবার এক একবার মনে হয়েছে, বেশ করেছেন, ঠিক করেছেন। বিহারের প্রান্তিক মানুষের জীবন, তাঁর লেখায় দারুণ উঠে এসেছে। “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাস যেমন লিরিক্যাল কোথাও কোথাও, তেমনই, গভীর রাজনৈতিক চেতনায় প্রোথিত। তাঁর অনেক উপন্যাসই তাই। খুব কাটাকাটা, খুব ন্যাকামোহীন, নির্মোহ, নিজের প্রতিও, নিজের নায়কদের প্রতিও, অনেকটা নায়িকাদের প্রতিও। এরকম ধারাবিবরণী বাংলায় লেখা কম উপন্যাসেই আছে। খানিকটা সমরেশ বসুর “যুগযুগ জীয়ে”তে কাছাকাছি কিছু স্বাদ পাই। তাও, এই উপন্যাসগুলি লেখার ধরণে অনেক আলাদা। আর এই সবের পরেও রচৌকে জিগালে, তাঁর সব জীবনদর্শনের মধ্যে, সব ছাপিয়ে, হয়তো কৈশোরের ভুবনমোহিনী রাণা উঠে আসবে, প্রথম চুমুর টেণ্ডারনেস নিয়ে। কিশোর পুরুষে।
এই লেখাটা আবেগতাড়িত। খাপছাড়া। কর্মক্লান্ত দিনের শেষে রাত দেড়টা থেকে তিনটের মধ্যে আজ লিখবোই, বলে লিখে ফেলা। পরে হয়তো সংশোধন করবো আরো। উপন্যাসগুলোর, প্রবন্ধগুলোর, কবিতাগুলোর, ইদানীং লেখা ওনার কিছু কেমন-যেন-ভাল-না কবিতাগুলোও আলোচনা করা যাবে আরো কিছু। তবে এই লেখা অনেকাংশে ব্যক্তিগত ভাবের লেখা। তাই এভাবেই অকপটে লিখছি। আমার গবেষণাপত্রটি যখন শেষও হয় নি, রচৌ আমাকে তখনই খুব উতসাহ দিতেন। আমাকে নিয়ে তাঁর যে অবন্তিকা, তা তখনই লেখা। পরে যখন গবেষণাপত্রটি বেরোলো, আমার ক্ষীণ অনুরোধ থাকা সত্ত্বেও, ফেসবুকে প্রায় সাতশোবার শেয়ার হওয়া এই লেখা, এবং আরো অনেকবার শেয়ার হওয়া লেখার নানান রেফারেন্স কিছুতেই টুইটারের মুখ দেখলো না বাঙ্গালি সমাজে। অথচ টুইটার কাউণ্টই জার্নাল মেট্রিক গ্রাহ্য করে। এই অশীতিপর বৃদ্ধ তখন, না বলতেই, বহুবার, চুপচাপ, এন্তার লোককে, সংস্থাকে ট্যাগ করে, টুইট করেছেন আমার গবেষণার লিংক, বহুদিন। ভালোবাসি কি সাধে?
আমি যখন ভুলভাল কবিতা লিখতাম, একেবারে বাজে লিখতাম, একবার ওনাকে বলেছিলাম, “এই ছাপোষা জীবন! কোথাও যাই না। চাকরি, ছেলে, আর পড়াশুনো। কবিতায় প্রেমের, পৃথিবীর, মানুষের হাওয়া লাগবে কী করে?”। উনি দুকথায় বলেছিলেন “এটা কোন কাজের কথা না। লিখে যাও। হবে”। তারপর বলেছিলাম, “এখন চাকরি, গবেষণা (গবেষণা না ছাই)। সাহিত্য বাকি পরে পড়বো”। উনি বলেছিলেন, “এটা কোন কাজের কথা না। কমবয়সে না পড়লে রেসেপটিভিটি থাকে না, এখনই পড়তে হবে”। এই দুটো আপাতঃসাধারণ কথা, ওনার গম্ভীর পৌরুষের জোরেই, আমায় পালটে দিয়েছিল অনেকটা।
এখন হাবিজাবি যা একটু লিখি, মনের দরজা খুলে গেছে তাই। মলয় রচৌরা বাংলাভাষাকে স্পর্ধা আর সাহস এনে দিয়েছিলেন। আমাকে, আমাদের এখনো সেই সাহস ভাঙ্গিয়েই খেতে হয়। আমাকে নিয়ে লেখা সেই কবিতাটা-
বহতা অংশুমালী, তোর ওই মহেঞ্জোদারোর লিপি উদ্ধার
কী গণিত কী গণিত মাথা ঝাঁঝা করে তোকে দেখে
ঝুঁকে আছিস টেবিলের ওপরে আলফা গামা পাই ফাই
কস থিটা জেড মাইনাস এক্স ইনটু আর কিছু নাই
অনন্তে রয়েছে বটে ধূমকেতুর জলে তোর আলোময় মুখ
প্রতিবিম্ব ঠিকরে এসে ঝরে যাচ্ছে রকেটের ফুলঝুরি জ্বেলে
কী জ্যামিতি কী জ্যামিতি ওরে ওরে ইউক্লিডিনি কবি
নিঃশ্বাসের ভাপ দিয়ে লিখছিস মঙ্গল থেকে অমঙ্গল
মোটেই আলাদা নয় কী রে বাবা ত্রিকোণমিতির জটিলতা
মারো গুলি প্রেম-ফেম, নাঃ, ফেমকে গুলি নয়, ওটার জন্যই
ঘামের ফসফরাস ওড়াচ্ছিস ব্রহ্মাণ্ড নিখিলে গুণ ভাগ যোগ
আর নিশ্ছিদ্র বিয়োগে প্রবলেম বলে কিছু নেই সবই সমাধান
জাস্ট তুমি পিক-আপ করে নাও কোন প্রবলেমটাকে
সবচেয়ে কঠিন আর সমস্যাতীত বলে মনে হয়, ব্যাস
ঝুঁকে পড়ো খোলা চুল লিপ্সটিকহীন হাসি কপালেতে ভাঁজ
গ্যাজেটের গর্ভ চিরে তুলে নিবি হরপ্পা-সিলের সেই বার্তাখানা
হাজার বছর আগে তোর সে-পুরুষ প্রেমপত্র লিখে রেখে গেছে
মহেঞ্জোদারোর লিপি দিয়ে ; এখন উদ্ধার তোকে করতে হবেই
বহতা অংশুমালী, পড় পড়, পড়ে বল ঠিক কী লিখেছিলুম তোকে–
অমরত্ব অমরত্ব ! বহতা অংশুমালী, বাদবাকি সবকিছু ভুলে গিয়ে
আমার চিঠির বার্তা তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে তুই আমাকে জানাস
------------------------------------------------------
লেখায় বানান ভুল আছে নিশ্চই। কাল ঠিক করবো। কত কথা বাদ গেলো। পরে ঢোকাবো। কিন্তু অনেক সন্তানের বৃদ্ধ পিতাকে প্রস্টেটের ওষুধ খাওয়াতে খাওয়াতে সবচে’ ছোট মেয়েটা যেমন পৌরুষের বেঞ্চমার্ক তৈরি ক’রে মনের মধ্যে সেই বেঞ্চমার্কের উপরের রাজকুমার খোঁজে, তেমনই এই অশীতিপর পিতৃপ্রতিমকে দেখি। আর যেমন ক’রে রিমা খান কঙ্কাল প্রেমিককে ভালোবাসে, ভালোবাসি এঁকে। স্বধর্মে স্থিত, অতি প্রচারমুখী, ঝপঝপ কমেণ্ট ক’রে মুশকিলে ফেলে দেওয়া স্নেহার্দ্র, প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। আমাদের খুব কাছে আছেন বলে, বড় বেশি ছোঁওয়া লেগে গেলো। দূরে চলে গেলে, মানুষ বুঝবে, গেলো কেউ। আর আমরা কেউ কেউ, একা ফ্ল্যাটে হাপসে কাঁদবো।